অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

হতে চাইলে গর্বিত সাংবাদিক -এম এ মোতালিব

91

মানুষ মানুষের জন্য। বিবেকবোধসম্পন্ন প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব হলো একে অন্যের মঙ্গলার্থে এগিয়ে আসা, সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা, সমাজ-দেশ-জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা। আমরা যে যে পেশায়ই থাকি না কেন, প্রতিটি পেশা হলো যার যার রুটি-রুজির একমাত্র অবলম্বন; সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যম। তাই আমরা যার যার অবস্থান থেকে প্রত্যেকেই যদি সততা ও নিষ্ঠার সহিত দায়িত্ব পালন করি, দেখা যাবে নিজের অজান্তেই সমাজের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, সভ্যতা আমাদের হাত ছানি দিয়ে ডাকছে। আসলে এটা কঠিন কোনো কাজ নয়। প্রতিটি সমস্যা যদি নিজের করে দেখা হয়, তাহলে সে সমস্যা আর সমস্যা থাকে না। তবে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের অবস্থান থেকে এই অনুভূতিটা জাগ্রত করতে হবে। আমার আজকের আলোচ্য বিষয় কিভাবে একজন দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন গর্বিত সাংবাদিক হওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা।
আসলে সাংবাদিকতা হলো সমাজ ও জনসেবামূলক গুরুত্বপূর্ণ একটি পেশা। এ পেশার সঙ্গে ‘মহৎ’ শব্দটি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। এ পেশার প্রতিটি ব্যক্তির প্রধান কাজ হলো সমাজে ঘটে যাওয়া সমস্যা, অন্যায়-অনিয়ম, দুর্নীতি প্রভৃতি জনসমক্ষে তুলে ধরা। পাশাপাশি ভালোটারও ভূয়সী প্রশংসা করা, যা দেখে সবাই সচেতন হবে কিংবা উদ্বুদ্ধ হবে, ভালো কাজে উৎসাহিত হবে। প্রভাবিত হয়ে নয়, প্রকৃত সত্যটাকে তুলে ধরাই হলো একজন সাংবাদিকের প্রথম এবং প্রধান কাজ। এ বিষয়গুলোর প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে এই মহান পেশার প্রতিটি ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের হতে হয় সাহসী, উদ্যমী, কর্মঠ, অকুতোভয়, বাচনভঙ্গিতে পারদর্শী, সততা, বিনয়ী, সত্য প্রকাশে কঠোর, সময়ের প্রতি সচেতন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ-শ্রদ্ধাশীল, ধৈর্য, সহনশীলতাসহ সব গুণের অধিকারী হতে হয় একজন সাংবাদিককে। যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় যেকোনো সংবাদ সংগ্রহে যেকোনো জায়গার গমন করার প্রস্তুতি সর্বদা রাখতে হয় তাদের। মনে রাখতে হবে জনগুরুত্বপূর্ণ সমাজসেবামূলক এ পেশাটা যেমন আনন্দের, তেমনি সম্মানের; পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণও বটে। এসব কিছু মাথায় রেখেই এ পেশায় আÍনিয়োগ করতে হবে। মনে রাখতে হবে সাংবাদিকের ক্ষুরধার লেখনী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রকে শীর্ষে পৌঁছে দিতে পারে, আবার একটি ভুল বা সততার ব্যত্যয় হলে ধ্বংসও অনিবার্য করে তোলে সেই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সমাজ বা রাষ্ট্রকে। প্রতিটি ব্যক্তি, বিশেষ করে একজন সাংবাদিককে তাঁর বিবেকবোধ থেকে কাজ করতে হয়। বিবেককে বিসর্জন দিলে হয়তো ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ হবে, সাময়িক লাভবানও হবে; কিন্তু মৃত্যু হবে মানবতার, মানবিকতার, সত্যের, সত্তার। মন থেকে আপন-পর ভেদাভেদ ভুলে যেতে হবে। সর্বদা ভাবতে হবে লেখনীর পবিত্রতা রক্ষায়, মানবতার কল্যাণে সে একজন ‘সত্যের সৈনিক’। সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সে নিয়োজিত একজন সমাজ প্রতিনিধি। এই ব্রত নিয়ে এ পেশায় আÍনিয়োগ করলে ব্যক্তি, সমাজ, দেশ, জাতি উপকৃত হবে; উপকৃত হবে ব্যক্তিসত্তা। তখন প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বস্তিবোধ হবে। এই মাসনিকতা গড়ে তোলাই বিবেকবোধসম্পন্ন একজন সাংবাদিকের মূল কাজ। এ তো গেল সাংবাদিকতা পেশার গুরুত্ব। এখন দেখা যাক একজন দক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকের দায়িত্ব কী হওয়া উচিত।
সাংবাদিক শব্দটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং এর বিস্তৃতি ব্যাপক। অল্প কথায় এর সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। তবু কিছু না বললেই নয়। বহু গুণে গুণান্বিত হতে হয় একজন সাংবাদিককে। আন্তর্জাতিক বিশ্ব, তথা রাষ্ট্র বা সমাজের সর্বস্তরের খোঁজখবর থাকতে হয় তাঁদের নখদর্পণে। শুধু খোঁজখবরই নয়, বিশ্বের কোথায় কী ঘটছে সে বিষয়ের সম্যক ধারণাসহ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে সমাজের বাস্তবচিত্র সঠিকভাবে তুলে ধরাই হবে একজন প্রকৃত সাংবাদিকের প্রথম ও প্রধান কাজ। তাই তো সাংবাদিকদের বলা হয় সমাজের দর্পণ। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেমন প্রকৃত দায়িত্ব জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করা, তদ্রƒপ সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সমাজের ভালো-মন্দ, নৈতিক-অনৈতিক, অপরাধ-দুর্নীতি, সফলতা-বিফলতার সার্বিক চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরা। এর ব্যত্যয় হলে কিংবা দায়িত্ববোধ ও পেশাদারিত্বের কথা ভুলে গিয়ে স্বজনপ্রীতি বা লোভ-লালসায় জড়িয়ে পড়লে কিংবা প্রকৃত ঘটনা জানার পরও তা গোপন করা, লোকানো কিংবা আড়ালের চেষ্টা করলে তাঁকে আর সাংবাদিক বলা যায় না, তিনি তখন নৈতিকতা হারিয়ে ফেলেন। তখন তাঁর গর্বিত ওই সাংবাদিক নামক মহান পেশার সামনে ‘হলুদ’ নামে একটি বিশেষণ যোগ হয়, যা তাঁর চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়। এই ‘হলুদ’ শব্দটি তখন পুরো এই পেশাকে কালিমালিপ্ত করে। কখনো কখনো তা ভাইরাসের মতো আক্রমণ করে পুরো সমাজের ধ্বংস অনিবার্য করে তোলে। তাই এ বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে, নিজের ব্যক্তিত্বকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার মানসে সর্বদা সচেষ্ট থেকে এগিয়ে চলাই হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন এ পেশার মূল কাজ। সাধারণত সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার সংবাদ বিবরণ এবং এ ধরনের সংবাদকে পুঁজি করে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িতÑএক কথায় তাঁরাই সাংবাদিক।
মনে রাখতে হবে সাংবাদিকের কোনো বন্ধু নেই। এ কথার অর্থ হলো বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন কিংবা একান্ত আপন ব্যক্তির অপরাধকেও সমাজের তুলে ধরতে কার্পণ্য করা যাবে না। ভালোকে ভালো, খারাপকে খারাপ বলার মানসিকতা ও সৎ সাহস সর্বদা বুকে ধারণ করতে হবে। কোনো অন্যায়ের সাথে আপস করা যাবে না। সর্বাগ্রে নিজে দায়িত্বসচেতন হতে হবে। এখানেই শেষ নয়, যেকোনো ভালো কাজে অন্যকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং খারাপকে নিরুসাহিত করতে হবে বিভিন্ন প্রতিবেদনের মাধ্যমে। বোঝাতে হবে, একজন অসহায় ব্যক্তি নিতান্তই অসহায় হয়ে একটু সহানুভূতির আশায় অন্যের স্মরণাপন্ন হয়, অন্যের দারস্ত হয়। সেখান থেকে আশাহত হলে তার আর কোনো আশ্রয় থাকে না। তার এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কোনো ধরনের ফায়দা লোটা কিংবা স্বার্থ হাসিল করা অত্যন্ত ঘৃণীত ও হীন মানসিকতার পরিচায়ক। এটা সর্বদা মনে রাখতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি যেকোনো সময় যে কারো জীবনে ঘটতে পারে। তাই অন্যের সমস্যাকে একান্তই নিজের সমস্যা বলে অনুভব করলে প্রতিটি ব্যক্তির আস্থা ও সম্মানের জায়গাটা দৃঢ় হয়। অন্যকে ভালোবাসলে, অন্যের স্বার্থের কথা চিন্তা করলে, নিজের স্বার্থ আপনা-আপনি প্রতিষ্ঠিত হয়, এর জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হয় না। কারণ ওই ভালোবাসার মানুষগুলোই একদিন তার জন্য ভালোবাসার সরোবর তৈরি করবে তাদের একান্ত ভালোবাসা দিয়ে। তাই বলব, অন্যের জন্য কিছু করা আর অন্যকে ভালোবাসার মতো তৃপ্তি পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

১৪ আগস্ট ২০১৭/সত্যের সৈনিক/সুলতান মাহমুদ

2 Comments
  1. Barik Ahmed says

    স্যার,আমি সিরাজগঞ্জ এ কাজ করতে চাই।

    Mb:01705 17 12 66

    1. Sultan Mahamud says

      আপনার ছবি সহ বয়োডাটা shottershoinik2017@gmail.com এই মেইলে পাঠিয়ে দিন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.