অনলাইন বাংলা সংবাদ পত্র

জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধ উন্নয়নের পূর্বশর্ত -এম এ মোতালিব

39

একটি দেশের উন্নয়নের গতিধারা নির্ভর করে সেই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো কতটা শক্তিশালী, ভিত কতটা মজবুত, তার ওপর। আর অর্থনৈতিক ভিতটা তখনই মজবুত হবে, যখন সর্বস্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে। এই দায়িত্ববোধটার জš§ হয় বিবেকবোধ থেকে, মানবিকতা থেকে। মনুষ্যত্ববোধ যাদের লোপ পায়, তাদের দ্বারা সমাজ-দেশ-জাতি কখনো উপকৃত হয় না। আমরা গর্বিত ও সুশিক্ষিত জাতি। আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কিন্তু সামাজিক প্রেক্ষাপটে অস্বচ্ছতার কারণে ওই শিক্ষিত লোকগুলো তাদের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না। একদিকে যেমন প্রকৃত শিক্ষার মূল্যায়ন করা হয় না, অন্যদিকে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের লোভ-লালসা ও দায়িত্বাবহেলার কারণে প্রতিটি সেক্টরে, প্রতিটি ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ভার বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের উন্নয়নের গতিধারা প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হয়। আর এর জন্য দায়ী অস্বচ্ছ সমাজব্যবস্থা, রুগ্ণ মানসিকতা। লোভ-লালসা দায়িত্বশীল গোষ্ঠীর অধিকাংশ ব্যক্তিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে রাষ্ট্রের উন্নয়নের পরিবর্তে ব্যক্তি উন্নয়নের দিকেই তারা অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়েছে। আমাদের দেশের এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে ক্ষুদ্র থেকে শুরু করে অতিমাত্রায় দুর্নীতি নেই। এটি একটি সভ্য জাতির জন্য যারপরনাই লজ্জাজনক। আমরা একবারও চিন্তা করি না যে দেশের উন্নয়ন হলে ব্যক্তি উন্নয়ন অবধারিত। সমাজে শান্তিশৃংখলা বজায় থাকলে আমরা চলাফেরায় স্বস্তি পাব। সবাই যদি একযোগে সবাই মানসিক পরিবর্তনের চিন্তা করি, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই, তাহলে সমাজ থেকে অন্যায় বিদূরিত হতে বাধ্য। স্বচ্ছতার সঙ্গে একটু পরিশ্রম করলেই যেখানে রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়ে যায়, সম্মানের সহিত বেঁচে থাকা যায়, সেখানে কেন নিজের বিবেককে বিসর্জন দিয়ে অবৈধ পন্থার দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে! প্রায় প্রতিটি সেক্টরই যেন অসততা আর দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। সামান্য একটি সরকারি চাকরির জন্য যখন লাখ লাখ টাকা উপরি গুনতে হয়, তখন চাকরি প্রার্থী ওই ব্যক্তিটা সর্বস্ব খুইয়ে, ভিটেমাটি বিক্রি করে, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দায়িত্বের আসনে আসীন হয়ে জাতির কোন উপকার করবে? তার তো অহর্নিশি চিন্তা থাকতে কত দিনে তার উপরির টাকা উসুল করতে পারবে। এ বিষয়টি কি আমাদের ভাবায় না? এখানে রাষ্ট্রের দুটি ক্ষতি অবধারিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এক. মেধাবীরা তাদের মেধার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, দুই. অযোগ্য ব্যক্তিরা অর্থের ডানায় ভর করে দায়িত্বে আসনে আসীন হয়ে ঘুষ-দুর্নীতি আর অন্যায়ের শাখা-প্রশাখা বৃদ্ধি করে। এভাবে প্রায় প্রতিটি সেক্টরে প্রতিনিয়ত কোটি কোটি টাকা উপরি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে বিবেকের মাথা খেয়ে। সমাজের সর্বস্তরে এই অসৎ ব্যক্তিদের প্রভাবে আমাদের সম্ভাবনাময় জাতি ক্রমান্বয়ে মেধাশূন্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এটা একদিকে যেমন সমাজ ধ্বংসের অন্যতম কারণ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বিবেকবোধবর্জিত পরিবেশে বেড়ে উঠছে। তারা যখন দেখছে টাকা দিলেই যেখানে চাকরি পাওয়া যায়, সেখানে কে যায় এত কষ্ট করে মেধা অর্জন করতে!
এখানেই শেষ নয়, অনেক দুঃখের সহিত বলতে হচ্ছে, সুসভ্য জাতি গঠনের কারিগর আমাদের শিক্ষক সমাজও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। তাদের কিছু ব্যক্তির অসততার কারণে জনসমাজে তাদের ভাবমূর্তি শূন্যের কোটায় নিমজ্জিত হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় অধিকাংশ শিক্ষক দুর্নীতি আর অসামাজিক কর্মকা-ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, প্রতিনিয়ত যার অসংখ্য প্রমাণ মেলে প্রচারিত ও প্রকার্শিত বিভিন্ন গণমাধ্যমে। বিতর্কিত এই শিক্ষকসমাজ জাতিকে কী শিক্ষা দেবে ভাবতে অবাক লাগে! এর জ্বলন্ত প্রমাণ হলো আমাদের শিক্ষামন্ত্রী যখন বলেন, কিছু শিক্ষক প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। আমরা এতটাই অথর্ব হয়ে পড়েছি যে দুর্নীতিবাজ অসাধু ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি দিতেও আমাদের দুবার ভাবতে হয়। এই পরিস্থিতি কি একদিনে তৈরি হয়েছে? এটাই কি আমাদের চাওয়া ছিল, এ জন্যই কি এ জাতির দামাল ছেলেরা স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে শত্রুর বুলেটের মুখে উš§ুক্ত বুক পেতে দিয়েছিল? মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য হায়েনাদের বর্বরতার শিকার হতে দ্বিধা করেনি তারা? কে দেবে এর জবাব? কোনো প্রকার অন্যায়ের কাছে যারা মাথানত করতে শেখেনি, তাদের এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের সেই স্বাধীনতা যেন আজ অন্তর্দহনে আর্তচিৎকার করছে।
স্বাধীনতার স্থপতি, স্বপ্নদ্রষ্টা ও বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনোই তো নিজের স্বার্থের কথা ভাবেননি। তিনি সর্বদাই ভেবেছেন এ দেশের সাড়ে সাত কোটি (বর্তমানে ১৬ কোটি) বাঙালি সন্তানের কথা। তিনি চেয়েছিলেন তাদের ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করতে। রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরে সৎ ব্যক্তিদের অধিষ্ঠিত করতে। তাঁর চাওয়ার মধ্যে তো কোনো কার্পণ্যতা ছিল না। তাইতো তিনি তৎকালীন পাকিস্তানি হায়েনাদের বিষাক্ত থাবা, অন্ধকার জেলের অকথ্য নির্যাতন সহ্য করে আমাদের স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে এনেছিলেন এই বাঙালি জাতির মাথায় সভ্যতার মুকুট পরাবেন বলে। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন একটি দেশ উপহার দেওয়া যার ছিল আজন্ম লালিত স্বপ্ন, তাঁকে আমরা এত তাড়াতাড়ি ভুলতে বসেছি? এতটাই অকৃতজ্ঞ আমরা? আমাদের আত্মকেন্দ্রিক রাজনীতি আর অরক্ষিত সমাজব্যবস্থা দেখে মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি আমরা ব্যর্থ? আমরা কি স্বাধীনতার প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করতে পারিনি? এই সবুজ-শ্যামল-মায়াবি মাতৃভূমিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তো আমাদের জš§ হয়নি! কিন্তু আজ আমরা লজ্জিত হই, যখন দেখি বিশ্বে দুর্নীতিতে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই; আমাদের গর্বিত মাথা নিচু হয়ে যায়, যখন দেখি বিভিন্ন সেক্টরে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ঘুষ-দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে সমাজে ক্ষত সৃষ্টি করছে; অপমানিত বোধ করি, যখন কাউকে অন্যের ভালোয় ঈর্শ্বান্বিত হয়ে তার ক্ষতি সাধনে ষড়যন্ত্রে সর্বদা লিপ্ত হতে দেখি; ব্যথিত হই, যখন দেখি সমাজের কর্তা ব্যক্তিরা নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে পার পাওয়ার অপচেষ্টা করে, আর এটা দেখেও না দেখার ভান করে সবাইকে চুপ থাকতে দেখি; কষ্ট লাগে, যখন দেখি দেশ গড়ার শপথ নিয়ে রাষ্ট্রের মহান দায়িত্বের আসনে বসে কোটি কোটি টাকা লোপাট করতে কিংবা বিবেক বিসর্জন দিয়ে আত্মস্থ করতে। চারদিকে এসব অনিয়ম দেখে হতাশা আমাদের বিবেকের ওপর সওয়ার হতে দ্বিধা করে না। স্বাধীনতার চার দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমরা ব্যর্থতার গ্লানি স্কন্ধে নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। হতাশা আর নিরাশা আমাদের যেন পিছু ছাড়ছে না। আমরা তো অভাগা জাতি নই! কিন্তু জোর করে যদি অভাগার তিলক আমাদের কপালে লেপন করে দেওয়া হয়, তাহলে স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কী হতে পারে!
শুনেছি আত্মসমালোচনা করা মহত্বের লক্ষণ। কিন্তু আমরা অন্যের সমালোচনা করতেই যেন বেশি পারঙ্গম। নিজের ভুল স্বীকার করতে আমরা কখনোই অভ্যস্ত নই। অন্যের ঘাড়ে দায় চাপানোর অপসংস্কৃতিটা যেন আমাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে গেছে। আগ-পিছ না ভেবে কিংবা সত্যাসত্যের বাছ-বিচার না করে কথায় কথায় দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিতে যেন কুণ্ঠিত হই না। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে পারাটা যেন আমাদের অক্ষমতায় পর্যবসিত হচ্ছে। কাক নাকি কুৎসিত ভক্ষণ করে চোখ বন্ধ করে। কারণ, কাকের ধারণা চোখ বন্ধ করে খেলে কেউই তাকে দেখবে না। আমরা যেন আজ সেই কাকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছি। এটা কতটা নির্বুদ্ধিতার পরিচয়, তা কখনোই ভাবি না। আমরা যেন তা বুঝেও না বোঝার ভান করি। এটা আমাদের মূর্খতা, না অজ্ঞানতা জানি না। অতি বিনয়ের সহিত বলছি, আমার এই কথাগুলো কেউ অপরাধ হিসেবে নেবেন না। বাস্তবতার নিরিখে চিন্তা করলে বোঝা যাবে, এগুলো সাধারণ জনগণের কথা। তাই আসুন না, অন্যের সমালোচনা না করে আমরা যার যেটা দায়িত্ব সেটা সততা ও স্বচ্ছতার সহিত সঠিকভাবে পালন করি। এতে কাজের গতি বাড়বে, সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, সাধারণ জনগণ তথা একে অন্যের আস্থা অর্জনে সক্ষম হব। এর চেয়ে মানসিক প্রশান্তি আর কী হতে পারে বলুন।
যত দিন আমাদের বোধোদ্বয় না হবে, বিবেকবোধ জাগ্রত না হবে, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হবে, তত দিন প্রকৃত সভ্যতা আমাদের নাগালের বাইরেই থেকে যাবে। এ জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। নিশ্চয়ই এটা আমরা কেউ কামনা করি না।

এম এ মোতালিব
কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

০১ আগস্ট ২০১৭/সত্যের সৈনিক/সুলতান মাহমুদ

Leave A Reply

Your email address will not be published.