বাদার মেয়ে -ময়না মনিরা

ছোট ফুফু সব সময় বলতো মারে আমার শ্বশুর বাড়ি আয়। এখানে সিনেমার পর্দা আছে। অনেক সিনেমা দেখতে পারবি। ফুফুর শ্বশুর বাড়ি সত্যি কি সিনেমার পর্দা আছে? সিনেমা দেখা যায়? ছোট এই আমি অনেক ভাবতাম। উৎসাহী চোখ নিয়ে মা-দাদিবুর দিকে তাকাতাম । তারা কেমন যেন মুচকিমুচকি হাসত। কিছুই  বুঝতে পারতাম না। দাদিবু হাসতে হাসতে বলতো, চল গিয়ে দেখে আসি!

গিয়েছি বার কয়েক। অনেক দূরের গ্রাম। একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। চলাচলের তেমন কোন মাধ্যম ছিল না। পায়ে হেটে অনেক দুর পর্যন্ত যেতে হতো। বর্ষায় মাটির রাস্তা কাদাঁ মাটিতে একাকার হয়ে থাকতো । অনেক ছোট ছিলাম । সিনেমার পর্দার কোনো উদঘাটন করতে পারিনি।

উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার পর চাচাতো বোনেরা মিলে বেড়াতে যাই ফুফু বাড়ি। ফুফুর শ্বাশুড়ী ও জা কাছে আসে। জা টা কেমন বড় একটা ঘুমটা টেনে আছে। জড়সড়ো একটা অবস্থা। কথা বললো ছোটছোট করে। শ্বাশুড়ীর নাকের দুইদিকে দুইটা নাকফুল, মাঝে একটা নাকছাপি পড়া।  কালো মিচমিচে গায়ের রঙ। কেমন কেমন করে যেন কথা বলে! আমরা কয়বোন হা হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছি। দেখে ফুফু রহস্যের হাসি দিয়ে রান্না ঘরে চলে যায়।

একটু পরে আসলো ফুফুর ছোট ননদ। সদ্যবিবাহিতা। ছিপছিপে শরীর, লম্বা। গায়ের রঙ মায়ের মতই। নাকটা বাঁশির মত। কি সুন্দর লজ্জা ভাব নিয়ে কথা বলছিল শুনেতে ভালই  লাগছিল। হঠাৎ  বাড়ীর বাহির হতে একজন ডাক দিলো, আলো মা, এইদিকে আয়। গামছা দে। ফুফুর ননদ চলে গেল। আমরা বুঝলাম ওনি ফুফুর শ্বশুর। ফুফুর শ্বশুর অনেক মজার মানুষ। আমাদের বাড়িতে অনেকবার গেছে। আত্মীয়তার দিক দিয়ে দাদাভাই হয়, তাই অনেক মজা নিয়ে আমাদের সাথে গল্প করে। কিছুক্ষণ পর দাদাভাইয়ের সাথে আমরা দেখা করতে গেলাম। দেখি বিছানায় বসে স্বামী-স্ত্রী মিলে গল্প করছে আর পান খাচ্ছে।

দাদাভাই কেমন আছেন?

আরে আমার দাদাভাইয়ের দল কেমন আছ? কখন আসছো? আসো আসো, কাছে এসে বসো।

বসতে পারি গল্প শুনাতে হবে। বলতে বলতে আমরা তাদের চারদিকে বসে পরলাম। দাদাভাই বললো কি দিয়ে শুরু করবো? একসাথে বলে উঠলাম দাদি আর আপনার প্রথম দেখা দিয়ে।

গল্প বলা শুরু করল দাদা। টগবগে যুবক আমি। রক্তে অন্য রকম শক্তি। কোনকিছুর বাধা মানে না। ইচ্ছা হল বাদাই যাব। (বলে রাখা ভাল–সুন্দরবনকে আমাদের অঞ্চলে বাদাও বলে) কাছ হতে বাঘ হরিণ দেখবো।  ঐখান  থেকে কোন ব্যবসা বাণিজ্য করব। যে কথা সেই কাজ, চলে গেলাম দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের সাথে বাদাতে। আমার এক মামা ছিল বাদার মধ্যে । সেখানে উঠলাম। কি জীবনরে ভাই! অনেক কষ্ট হত। কষ্টের দিন ফুরাল এক সময়। আর বেশিদিন এখানে থাকব না, চলে যাব ভাবছি আর বাদার পথে হাটছি ।  দেখলাম  একটা মেয়ে দৌড়াছে। কিছু একটা ধরতে চাচ্ছে। আমি মেয়েটাকে অনুসরন করলাম। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে সে হারিয়ে গেল। সামনে যাবো এমন সময় শুনি হাসির শব্দ। এ কি? মেয়েটি আমার পাশে   দাঁড়িয়ে। খাজায় একটা বন মুরগী। কুচকুচে কালো বর্ণের অল্প বসনে একটি মেয়ে। প্রকৃতির মতই নির্মল।

আমাকে খুজছিলেন? বলল মেয়েটি।

না, হ্যা আমি উত্তর দিলাম। হাসতে হাসতে সে একটা গাছের গোড়ায় গিয়ে বসলো। আমায় ইশারা করে তার পাশে বসতে বলল। আমি গিয়ে বসলাম। বিশ্বাস কর দাদাভাই আমি কিছু বলতে পারছিলাম না। শুধু শুনছিলাম আর দেখছিলাম। মেয়েটি কি সাবলীল ভাবে কথা বলছে!

কত জিজ্ঞাসা তার! কোথায় আপনার বাড়ী? জায়গাটা কেমন? আপনারা ধান চাষ করেন? অনেক মজা তাই না? আমার খুব যাতি ইচ্ছা করে ঐহনি।

আমি কথা বলা শুরু করলাম। প্রশ্ন করলাম তোমার ভয় করছেনা আমার সাথে এভাবে কথা বলতে?

একটা লজ্জাভাব নিয়ে সাবলীলভাবে উত্তর করলো জীব-জন্তুর সাথে থাকতি থাকতি হিংস্রতা আমরা চিনি ।  আপনি কয়দিন থাকবেন এহেনে?

দেখি কতদিন থাকা যায়!

থাইয়েন, থাইয়েন আমি আপনারে সুন্দরবন দ্যাহাবানে। এহেনকার সব সুন্দর জায়গা আমি চিনি।

চলতে থাকে মেয়েটির সাথে সুন্দরবন দেখা। বাদার এর কোথায় কি সুন্দর আছে আমি দেখেছি। আমাকে দেখিয়েছে কৃষ্ণ সুন্দরি। বনের মধ্যে ও যখন চুল ছেড়ে আমার আগে আগে দৌড়াতো, মনে হত আমি কোন বশরাই গোলাপের পাপড়ি মেলতে দেখছি। যখন গাছ থেকে ফুল-ফল পারতো মনে হতো এটা শুধু তাকেই মানায়! যখন মাছ ধরতো, মনে হতো নদীর ঢেউয়ের চেয়ে তার যৌবনের ঢেঊ অনেক বেশি  খরস্রোতা। যখন সে হাসতো মনে হতো সুন্দরবনের সকল সুন্দরের কলি এক সাথে বের হচ্ছে। তার চাঁহনি এতটাই নির্মল তাকালে হাজার হাজার ফুল গায়ে ঝরে পড়ার কমল প্রশান্তি পাওয়া যেতো। সে আমাকে মাঝেমাঝে এটা ওটা খেতে দিত। কখনো মাছ ভাজা, কখনো মধু দিয়ে রান্না করা শিন্নি। আমি যখন খেতাম, সে আমার মুখের দিকে মায়া ভরা চোখ নিয়ে চেয়ে থাকতো। আমার খাওয়া দেখে সে খুব তৃপ্তি পেতো। আমি কি কোনো দিন এমন মায়া, এমন সুখ পেয়েছি? আমি কি কখনো এতসুন্দর একসাথে দেখছি? না, দেখিনি!

আব্বা-আম্ম ছোট বেলায়ই মারা যায়। দাদা-দাদি মানুষ করছে। তারাও একসময় চলে যান। তাদের বেশ সম্পত্তি ছিল, যা সব আমার হল। কিন্তু আমি ভালোবাসাহীন হয়ে গেলাম। দূরসম্পর্কের এক চাচা-চাচি আমার কাছে ছিল। তারপরও সম্পত্তি আগলিয়ে রাখা আর প্রত্যান্ত অঞ্চল হতে দূরে গিয়ে লেখাপড়া করা সম্ভব হয়নি। মোটামুটি পর্যায় পর্যন্ত লেখাপড়া করলাম। যত বড় হচ্ছিলাম ততই কিসের যেন অভাব বোধ করছিলাম! আজ কেন জানি সেই অভাব আর বোধ হচ্ছে না। তাহলে এই তরুণীই কি আমার সে অভাব পূরণ করেছে?

বাদাই আসছিলাম সুন্দরি আর গোলপাতার ব্যবসা করবো বলে। কিন্তু বাদার সুন্দরির দেখা পেলাম। যে আমাকে প্রশান্তি দেয়, যার চাওয়া আকাশচুম্বি নয়। সেইতো আমার জীবনসঙ্গী। একদিন তাকে বিয়ে করে নিয়ে আসলাম। অনেকে তার গায়ের রঙের কথা বলেছে। বাদার মেয়ে হিসেবে তাছিল্য করছে। কিন্তু আমি প্রতিনিয়ত তার মনের রঙ দেখেছি, গায়ের রঙ নয় । দেখেছি  বাদার সৌন্দয্য, হিংস্রতা নয়। এতবছর সংসার জীবনে প্রতিদিন তাকে আমি নতুনভাবে পেয়েছি।

দাদাভাইয়ের গল্প শুনছিলাম আর কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম আমরা। পরদিন বাড়ি ফিরব। সিদ্ধান্ত নিলাম নদীর ধার দিয়ে হাটতে হাটতে যাব।

চলতে চলতে প্রত্যেকেই যেন আনমনা হয়ে যাচ্ছি । একসময়  নদীর ধারে বসে পরলাম । আলোচনা শুরু করলাম কার মনে কি হচ্ছে। সবার একই অবস্থা । সিনেমা দেখার পর-প্রিয় অভিনেতা অভিনেত্রীর বিভিন্ন দৃশ্য যেমন মনের চোখে ভেসে উঠে, ঠিক তেমনি ফুফুর শ্বশুর বাড়ির দৃশ্যগুলো ভেসে উঠছে । বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর মিলাচ্ছি ।

মনে পড়ল বড় হওয়ার পর মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মা ফুফু অনেক সুন্দর, সবার ছোট, অনেক আদরের।  কিন্তু বিয়ে এমন ছেলের সাথে কেন দিলে? ফুফা তার মায়ের বর্ণের। আবার অজো পড়াগায়ের, তাই আমার প্রশ্নটা স্বাভাবিক ছিল।

মা উত্তর করছিলো- তোমার ফুফু তো অনেক সুখি! সুখ থাকলে পরিবেশ কোন ব্যাপার না। আমার আরো বেশি আগ্রহ দেখে একসময় মা বলেই ফেললো গোপন রহস্য।

আমাদের বাড়িতে থাকত জাহিদ নামের এক ছেলে। যে আমার আব্বার পিছন পিছন ঘুরতো। ফুফু আর  তার সাথে কোন একটা ভাব তৈরি হয়েছিল। আব্বা দাদাভাই অনেকটা মান সন্মানের ভয়ে ফুফুর বিয়ে  দেয় প্রত্যন্ত অঞ্চন। যাতে সহজে ফুফুর সাথে জাহিদের দেখা না হয়। মনে হয় দাদাভাই আব্বা ঠিক কাজটাই করছিল।

আজ জাহিদকে সবাই চিটার জাহিদ নামে চেনে।

আর আমার ফুফা কতটাই না সুখে রাখছে আমার ফুফুটাকে। ফুফু চার সন্তানের মা। অনেকটা বয়স হয়েছে। কিন্তু দেখলে মনে হয় না। শুধু ফুফুর শ্বশুর শ্বাশুড়ির ভালবাসার  দৃশ্য দেখিনি। দেখেছি ফুফু-ফুফার ভালবাসার দৃশ্য। সবই দেখছিলাম চুপিচুপি। কারণ সম্পর্কটা দৃশ্য দেখার সাথে মানায় না।

আমাদের মাঝে দৃশ্যগুলো দেখার একটা নেশা কাজ করছিল। তাই স্পাইয়ের মত দৃশ্য খুজতেছিলাম। ধারণও করেছিলাম অসংখ্য। ঐযে ফুফা যখন মাছ ধরছিল ফুফু পিছন থেকে বললো –জেলের জ্বাল ফেলাতো মোটেই ভাল নয় । ফুফা উত্তর করল জেলেনী তো ফেলতে পারে? তারপর চারদিক তাকিয়ে গায়ে একটা কাঁকড়া ছুড়ে দিল। আর ফুফুর চিৎকার। সাথে সাথে ফুফা কাছে এসে বললো কি! আর ফোঁড়ন কাটবে? ফুফু পাশ থেকে ময়লা ছুড়ে মারল। এটা নিয়ে হাসাহাসি করল দুজন মিলে। ফুফু কি একটা ফুফার গালে ভরে দিল । ফুফা খুব মজা করে খেলো।

অনেক মাছ ধরে যখন ফিরছিলো, মাঝপথে পান বরজে ঢুকলো। ফুফু বলল বরজয়ালার বরজ ত অনেক লতায়ছে! প্রতিউত্তর আসল হুম তার বউয়ের মত প্রতিটি শিশে জড়িয়ে উঠছে। এক সময় তারা বাঊলের মাচাঞ্চে বসল। ফুফু এমন ভাবে পা নাচাছিল মনে হচ্ছিল কোন ষোড়শী উচ্ছলতা প্রকাশ করছে।আর তাতে সায় দিচ্ছে তার স্বামী। তার প্রতিটা উচ্ছলতাই যে অনেক সুন্দর, শাড়ীর আচল আঙ্গুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে ফুফা বুঝাচ্ছিল। রাতে যখন বাউলের গানের আসর বসলো তারা এক সাথে বসেছিল । গানের সুরের সাথে তাদের দৃশ্য ছিল মনিকাঞ্চনযোগ ।

হাঁটছি আর ভাবছি, আজ বুঝি সিনেমার পর্দার উদ্ঘাটণ হল। কিন্তু ফুফু কি জানে? এই পর্দার বড় একজন তারকা সে? কখনো কী জানবে? তার ভাতিজিকে যে পর্দা দেখার দাওয়াত দিয়েছিল, সেখানে সেও উপস্থিত থাকবে? ভাবনাটা কোথায় যেন টানছে। বারবার হারিয়ে যাচ্ছি বাদায়। যেখানে বাস করতো এক কৃষ্ণসুন্দরি। যার ছোয়ায় ভালবাসার শিখা আছে। যা  প্রতিফলিত হয় চারধারে। সন্তান নাতি-নাতনিদের মাঝে। যার ভালবাসার দৃশ্য প্রতিনিয়ত পর্দায় ভেসে উঠে। সংসারের পর্দায়। তৈরি করে নতুন নতুন সুখের ছায়াছবি ।

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/সত্যের সৈনিক/সুলতান মাহমুদ

Leave A Reply

Your email address will not be published.